
মর্মকথা এক মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার
_________
একটা সময় বাংলা থিয়েটার ভরে উঠেছিল বিদেশি নাটকে।অনুবাদ বা রূপান্তরে কত যে আমেরিকান,ব্রিটিশ,রুশ,ফরাসি,জার্মান নাটককাররা আমাদের মঞ্চে পদার্পন করেছেন তা গুনে শেষ করা যাবে না।সেই সময় বিদেশি নাটক,থিয়েটার এক নাটককারদের নিয়ে লেখালেখি চর্চা চলত অবিরাম।আজকাল তা অনেকটাই কমে গেছে।
নবীন নাট্যদল প্রেক্ষা গত ৭ই ফেব্রুয়ারী মধুসূদন মঞ্চে তাদের নুতন নাটক মর্মকথা মঞ্চায়িত করল।নাটকটি প্রখ্যাত ব্রিটিশ নাট্যকার সমারসেট মমেরThe Sacred Flame অনুবাদ।নাটকটি মম লিখেছিলেন 1928 সালে।মমের আত্মজীবনী বিশ্লেষণ করলে জানা যায় 1927 সালে মমের স্ত্রী ডিভোর্সের ফাইল করেন এবং 1929 সালে তা কার্যকরী হয়।এটি মমকে মানসিক ভাবে খুব পীড়া দেয় এবং তিনি নুতনভাবে ভালোবাসার সংজ্ঞা নিরুপন করেন যে বিচ্ছেদই সব কিছু শেষ হয় না।The Sacred Flame remains when all ends.
আলোচ্য নাটকটি ভাবানুবাদ করেছেন পরিচালক চন্দ্রশেখর আচার্য্য নিজেই।এই নাটকে সমারসেট মমের নাটকের মূল গল্পটি বজায় রেখে সম্পূর্ণ ভারতীয় তথা বাঙালি আঙ্গিকে বর্তমান সময়ের নিরিখে কাহিনীকে এনে হাজির কবলেন।যেখানে বাড়ির বড় ছেলে ভীস্ম পাইলট,সদ্য বিবাহের পর বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর দেহের নিম্নাঙ্গ চিরকালের জন্য অকেজো হয়ে যায়।ভীস্ম তাঁর স্ত্রী লহারিকে অসম্ভব ভসলবাসে,এই ব্যর্থ দাম্পত্য ঘেরাটোপ থেকে ভীস্ম লহারীকে মুক্তি দিতে চায়।কিন্তু লহরীকে ছেড়ে দিতেও তাঁর কষ্ট হয়।এই সময় বিদেশ থেকে আসে ছোট ভাই অর্ক ।অর্কর সাথে লহরীর একটি অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।এদিকে ভীস্মকে সেবা করতে আসা নার্সও তাঁকে ভালোবেসে ফেলে এবং ভালোবেসেই সেবা করতে থাকে।এমনই এক পরিস্থিতিতে বড় ছেলে ভীষ্মর আকস্মিক মৃত্যু হয়।নার্সের মনে হয় এই মৃত্যু অস্বাভাবিক ।পারিবারিক ডাক্তারের দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেটকে সে চ্যালেঞ্জ জানায়।এইসময় বাড়িতে উপস্থিত হন এঁদের পারিবারিক বন্ধু প্রাক্তন CBI অফিসার বাল্মীকী ।ইনি আবার ভীস্মর মা শালিনির প্রতি অনুরক্ত।মৃত্যু রহস্য একের পর এক বিভিন্ন বাঁক নিতে থাকে।আমরা দেখতে থাকি বিভিন্ন মানসিক সম্পর্কের দিস্তরীয় ও ত্রিস্তরী য় রূপ।দেখতে পাই ইংরেজ কবি দার্শনিক কোলরিজ এর কবিতার প্রতিচ্ছবি।
All thoughts,all passions,all delights
Whatever stirs this hortal frame,
All are but ministers of love,
And feed his sacred flame
নাটকটি তখন আর নিছক মৃত্যু রহস্য থেমে থাকে না।নাটকটি larger than life এর গল্প শোনায়।নাটকটি দেশ কালের গণ্ডী পেরিয়ে এক বৃহত্তর জীবনের আদর্শের কথা বলে।আরও বেশী করে আমাদের মানুষ হতে শেখায়।এখানে নাটকের সার্থকতা।তবে নাটকটির মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারকে চাপিয়ে মূল বিষয়টা উঠে আসে তা EUTHANSIA বিশ্ববিখ্যাত চিত্রপরিচালক গোদারের সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত নাট্যকার তার নাটকে এনেছেন।আমাদের দেশীয় পরিকাঠামো ও মানসিকতায় তা বিতর্ক দেবী করতেই পারে।পরিচালক চন্দ্রশেখর আচার্য্য এই মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারটিকে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে সাজিয়েছেন।নিখুঁত সংলাপ ও compostion দর্শককে বাদ্য করে আসনে টানটান হয়ে বসে থাকতে।
এই নাটকে অভিনয় করতে হলে অভিনেতাদের বুদ্ধিদীপ্ত মননসম্পন্ন ব্যাক্তিত্বের অধিকারী হতেই হবে।প্রত্যেক অভিনেতারাই সফলতার সঙ্গে এই কাজ করেছেন।বিশেষ করে লহরী চরিত্রে সুব্রতা সাহা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে চরিত্রটির দ্বিমাত্রিক রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন।তাঁর সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেছেন মহুয়া ব্যানার্জী নার্স (জাহ্নবী) এর চরিত্রে।একটি দৃশ্যে এঁদের যুগলবন্দী মুগ্ধ করে।অর্ক চরিত্রে কুমার সঞ্জয় তাঁর অভিনয় দক্ষতার ছাপ রেখে যান।তা ছাড়াও মনে দাগ রেখে যায় ভীষ্মরূপী প্রলয় কুমার ঘোষ,মায়ের চরিত্রে বুলবুল বসাক,ডাক্তারের ভূমিকায় প্রশান্ত দত্ত ও বোবা ভৃত্যের চরিত্রে সৌমেন্দ্র দাস।প্রত্যেকের অভিনয় প্রশংসার দেবী রাখে।বাল্মিকী চরিত্রে মানস চক্রবর্তীর অভিনয় উল্লেখ না করলে এ প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
পরিচালকের মাঞ্চভাবনা সার্থক রূপায়ন করেছেন অজিত রায়।সৈকত মান্না আলোক সম্পাতে বিভিন্ন মুহুর্তকে অর্থবহ করে তুলেছেন ও রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন যা এই প্রযোজনার জন্য খুবই জরূরী ছিল।তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজা বানার্জী আবহ প্রক্ষেপন করেছেন।রাজা ও সৈকতের যুগলবন্দী এ নাটকের অমূল্য সম্পদ।
সব মিলিয়ে একটি পরিপূর্ন উপভোগ্য প্রযোজনা উপহার দেবার জন্য চন্দ্রশেখর আচার্য্য এবং প্রেক্ষা দলকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন।