
মামলা জারি থাকবে
নাটক - সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়
পরিমার্জনা ও পরিচালনা - সুজন মুখোপাধ্যায়
সময়টা ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাস। আবহাওয়া ঠাণ্ডা। কিন্তু বাতাসে চাপা উত্তেজনা। কিছুদিন আগে শেষ হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধ’। নকশাল-বাড়ি আন্দোলন স্তিমিত তবে শেষ হয়েছে কিনা বলা শক্ত।
কলকাতা এখন নতুন করে উত্তাল এক ধনী অবিবাহিতা প্রৌঢ়ার খুনের ঘটনায়। মাথার পেছনে বাড়ি মেরে নৃশংস ভাবে খুন করা হয়েছে মহিলাকে। ওনার এক মাত্র সঙ্গী এক পরিচারিকা তখন বাড়িতে ছিলেন না। অল্প বয়সী এক যুবক, যাকে মহিলা বিশেষ স্নেহ করতেন তিনি সেদিন তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন। পরিচারিকা মাঝে অল্প সময়ের জন্য বাড়িতে ফেরেন এবং বন্ধ দরজার বাইরে থেকে গলার আওয়াজ শুনে তার ধারণা হয় সেই যুবক ও মহিলা গল্প করছেন।
সেই যুবকের বিচার শুরু হয়েছে। যুবকের আত্মপক্ষ সমর্থনে একটাই যুক্তি – মহিলা যখন খুন হয়েছেন তিনি বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। এ ব্যাপারে সাক্ষী তার স্ত্রী। আর কোন সাক্ষী নেই।
যুবকের হয়ে মামলা লড়ছেন কলকাতার এক বিখ্যাত ব্যারিস্টার। তখনকার নিয়মে জুরীরাও আছেন। যুবক মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত ছিলেন। সেখানেই তাঁর সাথে আলাপ তাঁর বর্তমান স্ত্রীর – যার সাক্ষ্য এখন তাঁর একমাত্র ভরসা। এই মহিলা ওদেশে থিয়েটারে যুক্ত ছিলেন। গান জানেন। এদেশে বারে গান করেন সংসার চালাতে। যুবকের তেমন কোন আয় নেই। মহিলার পরিবার শেষ হয়ে গিয়েছে খান সেনার হাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এ।
যুবকের গলার খুব কাছে ফাঁসীর দড়ি এসে গিয়েছে দুটি ঘটনায়।
এক – জানা গিয়েছে মৃতা মহিলা তাঁর বিপুল সম্পত্তি দিয়ে গিয়েছেন যুবককে। আর দুই – আইনের বিচারে পতিব্রতা স্ত্রীর স্বামীর সমর্থনে সাক্ষ্যের কোন আইনি গুরুত্ব নেই। তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধি প্রয়োগ করে লড়ে চলেছেন ব্যারিস্টার সাহেব। কিন্তু কাজ হচ্ছে না বিশেষ। দড়ির ফাঁস আরও চেপে বসছে যুবকের গলায়।
এই সময় সেই যুবকের স্ত্রীকে দেখা গেল সে এসেছে সাক্ষ্য দিতে – আসামী পক্ষের হয়ে নয়, বাদী পক্ষের হয়ে! সকলে হতবাক। কেন এই বিপরীতমুখী চলন? এরপরেও কি ব্যারিস্টার সাহেব পারবেন মক্কেলকে বাঁচাতে?
এর থেকেই উন্মোচিত হতে থাকে সত্য এবং তার সাথে আরও অনেক প্রশ্ন। আইন কি সত্যিই সবার না আইন তার যে আইনি বিচারের জন্য কড়ি গুণতে পারে? যেভাবে বিচার প্রক্রিয়া চলে তাতে কি পুরো সত্য উদ্ঘাটন নিশ্চিত করা যায় – বিদেশী আদালতে যাকে বলা হয় ‘The whole truth”? যে কোন বিচার সভায় একটি ঘটনার বিচার হয়, কখনোই বিচার হয় না কোন প্রেক্ষিতে সেই ঘটনা ঘটেছে। এই প্রেক্ষিত বাদ দিয়ে ঘটনার বিচার করে আমরা সমাজের কি উপকার করছি? এতে কি আমরা শুধু সমাজে কোন ব্যাধির উপসর্গের চিকিৎসা করছি না? মূল রোগ সারানোর সাথে এর যোগ কোথায়?